1. Home
  2. বিশ্ব
  3. এপস্টাইন কেলেঙ্কারি ও সিনাগগের সুড়ঙ্গগুলো কী বার্তা দেয়?
এপস্টাইন কেলেঙ্কারি ও সিনাগগের সুড়ঙ্গগুলো কী বার্তা দেয়?

এপস্টাইন কেলেঙ্কারি ও সিনাগগের সুড়ঙ্গগুলো কী বার্তা দেয়?

0
  • 20 hours ago,

মোসাদের গুপ্তচর জেফ্রি এডওয়ার্ড এপস্টাইন ইসরায়েলের স্বার্থে বিশ্বের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণে আনতে যে নোংরা যৌন ফাঁদ তৈরি করেছিলেন, তার প্রকাশের পর সামনে আসা খবর ও প্রকাশিত নামের তালিকা বিশ্বজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

অনেকে একে “পেডোফিলিয়া” বলে আখ্যা দিচ্ছেন। কিন্তু এটিকে পেডোফিলিয়া বলা চরম ভুল। কারণ “পেডোফিলিয়া” বা “শিশুকামিতা” বলতে বোঝায়—প্রাপ্তবয়স্ক কোনো ব্যক্তির বয়ঃসন্ধির আগের শিশুদের প্রতি যৌন আকর্ষণ অনুভব করা, যা একটি মনঃযৌন রোগ হিসেবে বিবেচিত। অর্থাৎ পেডোফিলিয়া এক ধরনের রোগ।

কিন্তু মোসাদ সদস্য জেফ্রি এপস্টাইনের কৃতকর্ম এই সংজ্ঞাকে বহু গুণ ছাড়িয়ে গেছে। এটি কোনো অনিচ্ছাকৃত রোগজনিত অপরাধ নয়, বরং সম্পূর্ণ সচেতনভাবে সংঘটিত একটি জঘন্য অপরাধ। তাই বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে ব্যবহৃত শব্দ ও ধারণা সঠিক হওয়া জরুরি।

মোসাদ তথা ইসরায়েল যা করেছে, তা হলো বিশ্বের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ইসরাইল, ইহুদিবাদ ও জায়নবাদের স্বার্থে ব্যবহার করার জন্য তাদের যৌন ফাঁদে ফেলা। এসব ব্যক্তির অপরাধ ও পাপাচারের ছবি ও ভিডিও মোসাদ নিজেই ধারণ করে পরে তা হুমকি ও ব্ল্যাকমেইলের অস্ত্রে রূপান্তর করেছে। এর মাধ্যমে ওই ব্যক্তিদের ক্ষমতা ও প্রভাব নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করা হয়েছে।

অতএব এটি কোনো ব্যক্তিগত “পেডোফিলিয়া” অপরাধ নয়; এটি একটি সংগঠিত, প্রাতিষ্ঠানিক ও সমষ্টিগত অপরাধ—ঠিক যেমন গণহত্যা একটি সংগঠিত অপরাধ।

২০১৯ সালে কারাগারে তাকে হত্যা করা হয় বলে ধারণা করা হয়। এর ফলে শুধু তার মামলাই নয়, তার গোপন ও কলুষিত যোগাযোগগুলোও সচেতনভাবে আড়াল করা হয়।

কে এই জেফ্রি এডওয়ার্ড এপস্টাইন: জেফ্রি এপস্টাইন ১৯৫৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে একটি ইহুদি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার মা পলিন একটি স্কুলে পরিচ্ছন্নতাকর্মী ছিলেন এবং বাবা সেমুর এপস্টাইন নিউইয়র্কের পার্কে একজন সাধারণ মালি হিসেবে কাজ করতেন। জেফ্রি নিজে ছিলেন একজন শিক্ষক।

প্রশ্ন হলো—এমন একটি পরিবার ও পেশা থেকে তিনি কীভাবে বিশ্বখ্যাত কোটিপতিতে পরিণত হলেন? আজ পর্যন্ত কেউ এর বিশ্বাসযোগ্য উত্তর দিতে পারেনি।

জেফ্রি এপস্টাইন কোনো সাধারণ বিকৃত ব্যক্তি ছিলেন না; তিনি ইসরায়েলের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের হয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন প্রশিক্ষিত গুপ্তচর ছিলেন। নিজের আসল পরিচয় আড়াল করতে তিনি বিভিন্ন ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করে বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে “দান” করতেন—যা ছিল গোয়েন্দা কার্যক্রমের আড়াল।

২০০৮ সালে তিনি ১৮ বছরের নিচে বয়সী দুই কিশোরীকে যৌন শোষণের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন। বিতর্কিত এক সমঝোতার মাধ্যমে মাত্র ১৩ মাসের সাজা পেয়ে সহজেই রেহাই পান এবং তার আসল ভূমিকা চাপা দেওয়া হয়। কিন্তু ২০১৯ সালে ফ্লোরিডা ও নিউইয়র্কে শিশু যৌন নিপীড়ন ও পাচারের অভিযোগে আবার গ্রেপ্তার হন। গ্রেপ্তারের কয়েক দিনের মধ্যেই, ১০ আগস্ট ২০১৯, ম্যানহাটনের মেট্রোপলিটন কারাগারে তাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায় বলে খবর প্রচার হয়।

তদন্তমূলক সাংবাদিক জুলি কে. ব্রাউন বলেন,

“এফবিআই বা যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ কেউই আমাকে বিশ্বাস করাতে পারেনি যে এপস্টাইন আত্মহত্যা করেছে। বিচার শুরুর আগেই সে কেন হাল ছেড়ে দেবে?”

তিনি আরও উল্লেখ করেন—মৃত্যুর আগে এপস্টাইনের ঘাড়ের তিনটি হাড় ভাঙা ছিল এবং তাকে নজরদারিতে থাকা দুই কারারক্ষী রহস্যজনকভাবে ঘুমিয়ে পড়েছিল।

গিসলেন ম্যাক্সওয়েল ও রবার্ট ম্যাক্সওয়েল: এপস্টাইনের সাবেক প্রেমিকা গিসলেন ম্যাক্সওয়েল ছিলেন ব্রিটিশ মিডিয়া সম্রাট রবার্ট ম্যাক্সওয়েলের কন্যা। রবার্ট ম্যাক্সওয়েলও মোসাদের গুপ্তচর ছিলেন। গুরুতর অভিযোগ রয়েছে যে তিনিই এপস্টাইনকে মোসাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন।

রবার্ট ম্যাক্সওয়েল: রবার্ট ম্যাক্সওয়েল (ইয়ান রবার্ট ম্যাক্সওয়েল) ১৯২৩ সালে চেকোস্লোভাকিয়ায় এক দরিদ্র অর্থডক্স ইহুদি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। নাৎসি দখলদারিত্ব থেকে পালিয়ে তিনি মিডিয়া জগতে প্রবেশ করেন এবং ধীরে ধীরে এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। পরে তিনি ইতিহাসের অন্যতম বড় আর্থিক প্রতারকে পরিণত হন।

১৯৯১ সালে তার মরদেহ আটলান্টিক মহাসাগরে পাওয়া যায়। অভিযোগ রয়েছে—মোসাদের গুপ্তহত্যাকারী দল তাকে হত্যা করে সমুদ্রে ফেলে দেয়। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ তার পূর্ণ ময়নাতদন্তেও বাধা দেয়।

পুলিৎজারজয়ী সাংবাদিক সেমুর হার্শ তার বই The Samson Option-এ রবার্ট ম্যাক্সওয়েলকে মোসাদের এজেন্ট হিসেবে চিহ্নিত করেন—যা কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে অস্বীকার করা হয়নি।

এপস্টাইন ইস্যু আসলে কী: ২০০৭–২০০৮ সাল থেকে এপস্টাইন কাণ্ডকে মূলত হলিউড ও উচ্চবিত্তদের বিকৃত যৌন কেলেঙ্কারি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এর ফলে এটি একটি গাল-গপ্পে পরিণত হয় এবং প্রকৃত চিত্র আড়াল থাকে।

কিন্তু বাস্তবে এটি কোনো বিনোদনমূলক কেলেঙ্কারি নয়—এটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও কৌশলগত আধিপত্যের বিষয়। ভবিষ্যতে আরও স্পষ্ট হবে যে এটি যুক্তরাষ্ট্রসহ বহু দেশের জন্য জাতীয় নিরাপত্তা ও অস্তিত্বের প্রশ্ন।

মোসাদের মাধ্যমে ইসরায়েল বিশ্বের রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, গোয়েন্দা প্রধান, সামরিক কর্মকর্তা, মিডিয়া মালিক, শিল্পী ও ক্রীড়াবিদদের ব্ল্যাকমেইল করে কিভাবে নিয়ন্ত্রণে রেখেছে তার জলজ্যান্ত উদাহরণ।

সিনাগগের নিচে গোপন সুড়ঙ্গে কী হচ্ছে: ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে, নিউইয়র্কের ক্রাউন হাইটস এলাকায় ইহুদিদের উপাসনালয় হিসেবে ব্যবহৃত এক সিনাগগের নিচে অবৈধ সুড়ঙ্গ আবিষ্কৃত হয়। সেখানে রক্তমাখা বিছানা ও শিশুদের ব্যবহৃত জিনিসপত্র পাওয়া গেছে। এসব সুড়ঙ্গে শিশু পাচার, অঙ্গ পাচার ও যৌন নির্যাতনের মতো ভয়াবহ অভিযোগ উঠেছে। একই ধরনের ঘটনা মস্কোতেও দেখা গেছে।

এই সুড়ঙ্গগুলো ইউরোপ ও আমেরিকায় নিখোঁজ হাজারো শিশুর রহস্য উদঘাটন করতে পারে বলে দাবি করা হচ্ছে।

কিছুদিন আগে গাজার শিশুদের অঙ্গ পাচারে ইসরাইলের সেনাবাহিনী জড়িত থাকার অভিযোগ সম্বলিত রিপোর্ট প্রকাশ হয়েছে।

এগুলো ইঙ্গিত দেয় যে শিশু যৌন কেলাঙ্কারি নিছক একটা পেডোফিল এর বিষয় নয়। এটা বিশাল এক আন্তর্জাতিক চক্রান্তের হাতিয়ার যা ব্যবহার করা হচ্ছে ইসরাইল, জায়নবাদি এবং ইহুদিবাদি স্বার্থে।

শেষ কথা: এপস্টাইন কাণ্ড ছিল ইসরায়েলের হাতে থাকা এক ভয়ংকর অস্ত্র। কিন্তু ৭ অক্টোবরের আকসা তুফানের পর সেই অস্ত্র এখন উল্টো দিকেই তাক করা হয়েছে। এপস্টাইন ইস্যু এখন ইসরায়েল, জায়নবাদ ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধেই কাজ করছে।

এই যুদ্ধ ইসরায়েল জিততে পারবে না। আর তারা হারলে শুধু ইসরায়েল নয়—পেছনের সব শক্তিও হারবে। আর বেশি দেরি নেই…

লেখক: আলপের তান, উপ-পরিচালক সোশ্যাল থিঙ্কিং ইন্সটিটিউট (SDE) আঙ্কারা, তুরস্ক।

নিউজ টুডে বিডি/নিউজ ডেস্ক